মায়ের বকুনিতে অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রীর আত্মহত্যা

মায়ের বকুনিতে অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রীর আত্মহত্যা

 

দিব্যেন্দু দাস , Rong News

 

ভাই বোনদের মধ্যে ঝগড়ায় মায়ের বকুনি, আর তাতেই ফাঁসি নিয়ে আত্মহত্যা করল মাত্র অষ্টম শ্রেণীর এক ছাত্রী। এমনই চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটল পূর্ব মেদিনীপুর জেলার পটাশপুর থানার গোকুল পুর গ্রামে। অস্বাভাবিক এই ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বুদ্ধিজীবী মহল হতবাক শিশু কৈশোরের মেয়ের এমন ঘটনায়।

পরিবার এর সূত্রে জানা গেছে বাবা পেশায় একজন প্রসিদ্ধ কীর্তন শিল্পী, কীর্তন গানে বাইরে ছিলেন । মা , দু মেয়ে ও এক ছেলে দাদু ঠাকুমার হাসি খুশি সংসারে নিত্য দিনের মতো সকাল সকাল তিন ভাই বোনদের মধ্যে শীতের রোদ পোহানো ও পড়াশোনা চলে। মা দাদু ঠাকুমা সংসারের কাজে ব্যস্ত , মাঠে চাষের কাজ ও চলছে। এমন সময় দুই বোনের মধ্যে কোন বিষয় নিয়ে ঝগড়া খুনসুটি হয়। কাজের চাপ এদিকে মেয়েদের ঝগড়া শুনে মা দু মেয়ে কেই বকা দেন। বড় মেয়ে একাদশ শ্রেণীতে ও ছোট মেয়ে অষ্টম শ্রেণীতে ছোট ভাই চতুর্থ শ্রেণীতে গ্রামের বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। মায়ের বকুনি শুনে ছোট মেয়ে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা এর চেষ্টা করে। মা দেখতে পেয়ে মেয়ের হাত থেকে দড়ি ছাড়িয়ে বকুনি দেন এসব কাজের জন্য। এরপর মা কাজে ব্যস্ত হলে মেয়েটি পুনরায় ফাঁক দেখে গলায় ওড়না নিয়ে আত্মহত্যা করে।

ডাক্তার এসে মৃত বলে ঘোষণা করলে , পটাশপুর থানার পুলিশ কে খবর দেওয়া হয়, পুলিশ এসে দেহ টি ময়নাতদন্তের জন্য নিয়ে যান। এইটুকু বয়সের মেয়ের এমন ঘটনায় পরিবারের সাথে সাথে গ্রামের সকল মানুষও হতবাক , শোকস্তব্ধ। মেয়েটির বিদ্যালয়ের শিক্ষক শিক্ষিকা বৃন্দ ঘটনার কথা শুনে বলেন মেয়েটি পড়াশোনা তে খুবই ভালো ছিল। গত দু’বছর করোনার জন্য সেভাবে স্কুলে আসেনি। নিয়মিত বিদ্যালয়ে না যেতে পারা ও পড়াশোনা এর মধ্যে না থাকাকেই এইসব ঘটনার জন্য দায়ী করছেন শিক্ষক মহল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য প্রশাসনিক সূত্রে এক রিপোর্টে দেখা গেছে পূর্ব মেদিনীপুরের এই পটাশপুর থানা ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় মানুষের আত্মহত্যা এর প্রবণতা বেশি।

মনোবিদ মৌমিতা ঘোষ দস্তিদারের কথায় “ এরকম ঘটনার প্রবণতা বাড়ছে কারণ পিতা মাতারা সন্তানের বেড়ে ওঠার সাথে মানসিক পরিবর্তন টাকে প্রাধান্য দিচ্ছেন না। বয়ঃসন্ধির সন্তানের সব মতামত কে ডমিনেট করা, অন্যের সাথে তুলনা করা- এইসব মা বাবার পরিবর্তন করা উচিত, তাদের সাথে বন্ধুর মত মেশে তাদের সমস্যার কথা শোনা উচিত। তৎসঙ্গে এও বলেন যে বর্তমানে টিভি সিরিয়াল এ সাংসারিক অশান্তি, রাগ অভিমান থেকে আত্মহত্যা এর সিন দেখানো শিশু কৈশোর বয়ঃসন্ধির ছেলেমেয়েদের মনে বিরূপ প্রভাব ফেলছে।”

মনোবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণারত সুমিতা পয়ড়্যার কথায় “ বয়ঃসন্ধিকালের ছেলেমেয়েদের আত্মহত্যা প্রবণতা প্রবল থাকে। তখন এরা কারোর কথা শুনতে চায় না, বুঝতে চায় না, অভিমানটা অনেক বেশি থাকে। একটা আত্ম অহংবোধ কাজ করে। ভাবে নিজে যা করছে সেটাই ঠিক।নিজে যা জানে সেটাই ঠিক। সুকান্ত যেমন বলেছিলেন, আঠারো বছর কোন বাধা মানে না।এরাও ঠিক অনেকটা ওই রকম হয়। কারুর কথা এদের ভালো লাগেনা। অবশ্য বন্ধুদের কথা শোনে। কিন্তু ভালো বন্ধু না পেলে তখন এই ঘটনাগুলো ঘটে যায়।এদের মাথায় তখন কাজ করে না বাবা মা কত কষ্ট করে মানুষ করলেন । সামান্য কারণে নিজেকে শেষ করে দিয়ে ভাবে সবাইকে শাস্তি দিলাম। ‘আমি চলে গেলে দেখো তোমাদের কেমন লাগে!’ অন্যদের কে জব্দ করার এটা নাকি এক ধরনের প্রথা।এরা ভয় দেখায়।এরা দুঃখ বেদনা যন্ত্রণা নিতে পারে না।এরা খালি সুখের অন্বেষণে থাকে। তাতে কারুর কষ্ট হলেও ওদের কিছু যায় আসে না। ভারসাম্য হীনতা, নেশা থেকে, ঘুম কম হলে হতাশা আসে, বিষন্নতা, উদ্বিগ্নতা, দারিদ্রতা, ভালোবাসা—এগুলোর জন্য আত্মহত্যা করে থাকে। আত্মহত্যা একটি ছোঁয়াচে রোগ। বিদ্রুপাত্মক, ব্যঙ্গাত্মক, টিপ্পনী মানুষকে অনেক বেশি অসহায় করে তোলে। আর তাতেই এই পথ বেছে নেয়। ”

আত্মহত্যা এর প্রবণতা বিনাশ হোক , সুস্থ সুন্দর সমাজ গড়ে উঠুক। আগামী প্রজন্ম আত্মনির্ভর হোক দেশের দশের কথা ভাবুক । বিদ্যালয়ের দরজা খুলে গেলে হয়তো এইসব ছোট ছোট প্রান গুলি সুস্থ সামাজিক স্রোতে ফিরে আসবে।

 

Sub Editor- Ramananda Das

Editor- Dibyendu Das

Editor in chief- Rakesh Sharma

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *